বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

কোথায় চলেছে স্বদেশ?

কোথায় চলেছে স্বদেশ?

বিজ্ঞাপন
তায়েব মিল্লাত হোসেন : আমি যেখানে বসবাস করি, তার উল্টো পাশেই আটতলা একটি ভবন। ঢাকা ওয়াসার অনুমোদন নিয়ে তারা পানির পাম্প বসিয়ে নিয়েছেন। রোজ বিকেলেই সেখানে পানি নিতে আসেন আশপাশের অনেকে। কারণ ওয়াসার নিজস্ব পাম্পের সরবরাহ লাইনে মিলছে না পানি। তাই চেয়েচিন্তে পানি নেওয়ার লাইন দিনে দিনে লম্বা হচ্ছে। শুধু পানি নিয়ে নয়, ঢাকাবাসীকে গ্যাস, বিদ্যুৎ নিয়েও ভাবনায় থাকতে হচ্ছে। রাজধানী শহরের চিত্রটি যদি এমন হয়, তাহলে সারা দেশের পরিস্থিতি কেমন? কোথাও লোডশেডিং, কোথাও গ্যাস সংকট, কোথাও পানির সমস্যা- এই আমাদের হালের বাংলাদেশ। নিশ্চিত করেই বলা যায়, ছয় মাস বয়সী বিএনপি সরকার এসব সংকটের জন্য এককভাবে দায়ী নয়। তারা উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু সমস্যা হাতে পেয়েছে। আর বৈশ্বিক স্তরের কিছু যুদ্ধ সংকট আরও ঘনীভূত করেছে।
এসব বয়ান সামনে আনতে সরকারের নীতিনির্ধারকেরাও ভুল করছেন না। কিন্তু কথা হচ্ছে, যেখানে যেটুকু আছে, সেটুকু দিয়ে যথাযথ শৃঙ্খলার মাধ্যমে সেবাটি দেওয়া হচ্ছে না কেন? আমার এলাকা বাড্ডার কথা দিয়েই বোঝাতে পারি। বিদ্যুৎ চলে গেলে ঠিক এক ঘণ্টা পরই আসে, এটা ঠিক। বিষয়টি হচ্ছে কখন যাবে, সেই সময়টা একেক দিন একেক রকম। এ ক্ষেত্রে একজন নাগরিক যদি পুরো দিনের লোডশেডিংয়ের সময়সূচি আগেভাগে জানতে পারেন, তাহলে নিজেও সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারেন। ফলে ভোগান্তির মাত্রা কমে আসবে। আবাসিক গ্রাহকেরা না হয় কোনো রকমে দিনাতিপাত করছেন, শিল্পোদ্যোক্তা যারা, সরকার তাদের কীভাবে বুঝ দেবে? কারণ কলের চাকা যদি না ঘোরে, তারা ব্যবসা করবেন কীভাবে?
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নেতারা সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন ডেকে জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটে বন্ধ রাখা হয়েছে প্রায় ৩০০ কারখানা। উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মাসিক প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির লক্ষ্য ছিল তাদের। গ্যাস সংকটে দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দাবি রপ্তানিকারক নেতাদের।
এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দেশে সার সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। সার নিয়ে এরই মধ্যে সমস্যায় আছেন কৃষকেরা। আমন মৌসুমে বাজারে একধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সে কথা জানাচ্ছে সংবাদমাধ্যম। কোথাও চাহিদামতো সার মিলছে না। কোথাও কৃষকদের সংগ্রহ করতে হচ্ছে চড়া দামে। এই পরিস্থিতিতে তারা যে খুব বেশি দিন চুপচাপ বসে থাকবেন না, উত্তরবঙ্গ থেকে সদ্যই এসেছে সেই বার্তা। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে এক ডিলারের গুদাম ভেঙে রোববার (২২ আগস্ট) ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যায় কৃষকেরা। সেই সার উদ্ধারে অবশ্য পরে মাঠে নামে প্রশাসন। লুট যেমন আমরা দেখতে চাই না, আবার কৃষক সার নিয়ে ভোগান্তিতে থাকবে, সেটাও কাম্য নয়। তাই চাহিদামতো সার কীভাবে সরবরাহ করা যাবে, সেই সমাধান বের করতে হবে আমাদের সরকারকে। মুনাফাখোররা যাতে সার নিয়ে মেতে উঠতে না পারে, নজর দিতে হবে সেদিকেও। সবটা মিলে কৃষককে সুরক্ষা দেওয়াই সরকারের পয়লা নম্বরের কাজ হওয়া উচিত।
কৃষকের দিন ফেরাতে সরকারের মন আছে কি না, এখনো তা স্পষ্ট নয়। তবে আগের ইউনূস আমলের মতোই কথিত তৌহিদি জনতা একধরনের পেশিশক্তির মহড়া যে এখনো দেখাতে পারছে, সেটা নিশ্চিত। তাদের শাসানিতে কোথাও বন্ধ হচ্ছে গানের মাহফিল, কোথাও নৌকাবাইচ বন্ধ করে দিতে চাইছে তারা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় খোদ পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও সম্প্রতি এই তৌহিদি জনতার বাধায় ঠিকঠাকভাবে হতে পারেনি। এর জেরে উল্টো তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যারা গান-বাজনা বন্ধ করতে চান, তাদের জন্য যেন আরও খুশির খবর দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটিই এ রকম যে গান, বাজনা, সিনেমাÑএসব বহু বছর যাবৎ তাদের মধ্যে প্রায় নিষিদ্ধের মতো। সেখানকার পরিস্থিতি আলাদা। পরিবেশ বিবেচনায়, পরিস্থিতি বিবেচনায়, যেখানে যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সেটি নিয়েছি।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান, বাজনা, সিনেমা চলবে নাÑএমন লাইসেন্স কি দেওয়া হলো না এই কথার মাধ্যমে?
একই বক্তব্যে অবশ্য চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর বাণী দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়। তিনি বলেছেন, ‘আমরা শুধু চাঁদাবাজদের তালিকা করছি না, চাঁদাবাজির সঙ্গে যদি কোনো পুলিশ সদস্য জড়িত থাকে, তাদের তালিকাও করছি।’ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়ার আগে তিনি দেখতে গিয়েছিলেন চাঁদাবাজদের হামলায় আহত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক কান গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আসাদুর রহমানকে।
প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য দরকার, কিন্তু এর চেয়েও বেশি দরকার অ্যাকশন। তার ঘাটতি থাকার কারণেই কি না কে জানে, রংপুরের মতো শান্ত শহরে ঘরের মধ্যে চারজন খুন হয়ে গেল! শনিবার (২১ আগস্ট) রাতে শহরের কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে চারটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। যেখানে আছেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। হত্যার কারণ হিসেবে পুলিশ প্রথমে ধারণা করে, এটা ডাকাতি। পরের দিন সংবাদ সম্মেলন করে তারা জানায়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যা করা হয় তাঁদের। পুলিশের এ দাবি নিয়ে সংশয় প্রকাশ যেমন করছেন নিহত শিক্ষকের স্বজনেরা, দেশের নানা প্রান্তের মানুষও এই কার্যকারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
ছয় মাস পার করা বিএনপি সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী অবশ্য প্রশ্ন না-পছন্দ করা শুরু করেছেন। সদ্যই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া হুমায়ুন কবিরের কাছে একজন সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন, তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না। এর উত্তর ছোট্ট শব্দ ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলাতেই মিলে যেতে পারে। কিন্তু নবাগত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সেদিকে গেলেনই না। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বসলেন, কে এটা নিয়ে নিউজ করেছে, কার এত জ্বালা?
প্রতিবেদন যে প্রতিমন্ত্রী মহোদয়কে আরাম দেয়নি, সেটা তার নিজের উত্তরেই নিহিত। তবে সাধারণের প্রশ্নোত্তর প্রায়শই অর্থবহ না হতে পারে, কিন্তু যারা হর্তাকর্তা তাদের কথাবার্তায় কিন্তু আঁচ করা যায়, দেশটি কোন দিকে যাবে। আমরা বরং খানিকটা পেছনে তাকাই, ১৭ বছর পর দেশের মাটিতে পা রেখে বিএনপি-প্রধান তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান।’ তিনি এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তার পরিকল্পনা কী রয়েছে দেশ ও জনগণকে নিয়ে, তা স্পষ্ট হতে হতে আরও এক-দুই বছর লেগে যাবে। সেই সময়টুকু পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। অতএব, আপাতত এটুকু অপেক্ষা না হয় করি।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz