বাবা তুমি কোথায়? প্লিজ সামনে এসো...প্লিজ...বাবা...
ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করতে থাকে এমিলি। তারপর একসময় ঘুমের ভেতরই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে, ‘বাবা...আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি, বাবা...।’
কাঁদতে কাঁদতেই হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে যায় এমিলির। সে স্বপ্ন দেখছিল। খুব বাজে একটা স্বপ্ন। ছোট্টবেলার মতো সে আর বাবা লুকোচুরি খেলছিল। এবার ছিল বাবার লুকোবার পালা। সে দু’হাতে চোখ চেপে ধরে ম্যাপল গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনেছিল। তারপর একসময় চোখ ছেড়ে দিয়ে বাবাকে খুঁজতে শুরু করে। কোথাও খুঁজে পায় না বাবাকে। তাদের লুকোবার কমন জায়গাগুলো, যেমন গ্যারাজ, ব্যাকইয়ার্ড, স্টোর কিংবা বাথরুম কোথাও নেই বাবা। এরপর সে ভয় পেয়ে জোরে চিৎকার করে ডাকতে থাকে ‘বাবা’ বলে। কিন্তু অন্যদিনের মতো ছুটে এসে কোলে তুলে নেয় না তাকে। ভয় পেয়ে অবশেষে কাঁদতে শুরু করে এমিলি, আর ঠিক তখনই ঘুমটা ভেঙে যায় তার।
বাজে স্বপ্নের রেশ কাটাতে বেশ কিছুটা সময় গুম হয়ে বসে থাকে বিছানার ওপর। দেয়ালে টাঙানো রংচটা কাকু ঘড়িটার দিকে দৃষ্টি যায় তার। ঘড়ির কাঁটা আটটার ঘর ছুঁই-ছুঁই করছে। হঠাৎ তার মনে পড়ে, বাবাকে তো সকাল সাতটার ওষুধটা খাওয়ানো হয়নি। দ্রুত বিছানা থেকে নেমে বাবার ঘরের দিকে পা বাড়াতে গিয়েই মনে পড়ে যায় গতকালকের ঘটনাটা। বাবাকে তো আর ওষুধ খাওয়াতে হবে না তার। আর কোনো ঝক্কি পোহাতে হবে না বাবাকে নিয়ে, নিত্যদিন আর ঝগড়া করতে হবে না রিকার্ডোর সঙ্গে। কারণ গতকাল সে তার বাবাকে ফেলে এসেছে ম্যানহাটনের থার্টি ফোর স্ট্রিটের হ্যারল্ড স্কয়ার সাবওয়েতে!
কথাটা মনে হতেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে এমিলির। এ সময় দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার ওপর থেকে খুলে যায় ছোট ছোট ছয়টি বন্ধ জানালা, ছয়টি কোকিল জানালা থেকে মুখ বাড়িয়ে কু-কু করে ডেকে ওঠে আটবার, তারপর আবার বন্ধ হয়ে যায় জানালাগুলো। সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায় এমিলির স্মৃতির দুয়ার। একবার টিভিতে ঘড়ির বিজ্ঞাপনে এমন একটি ঘড়ি দেখে মুগ্ধ হয়েছিল সে। এক ঘণ্টা পরপর ঘড়ির ওপরের ছোট্ট ছয়টি জানালা খুলে ছয়টি কোকিলের বাচ্চা যে ক’টা বাজে, ঠিক সেই ক’টা ডাক দেয় কু...কু করে। তাই দেখে বাবার কাছে বায়না ধরেছিল এমন একটি ঘড়ির। এক সপ্তাহ পর একদিন বাবা ঠিকই ঘড়িটা কিনে নিয়ে এসেছিল তার জন্য। বাবার প্রতিদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পরও যে তাকে আরও দুটি ঘণ্টা করে বেশি কাজ করতে হয়েছে এক সপ্তাহ ধরে ঘড়ির ৭০ ডলার জোগাড় করতে, এ কথাটা তখনো বোঝার বয়স হয়নি এমিলির। সেই বাবাকে, তার সেই স্নেহপ্রবণ বাবাকে গতকাল সে ফেলে এসেছে সাবওয়েতে! আহা সেই বাবা, মা যখন তাকে ছয় বছরের ফেলে চলে গিয়েছিল তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে, অথচ বাবা তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল মেক্সিকো থেকে আমেরিকায়। তার গ্র্যান্ডমা বলেছিল, ‘বিদেশ-বিভুঁইয়ে অতটুকুন একটা বাচ্চা নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হবে তোমাকে। তার চাইতে ওকে রেখে যাও আমার কাছে, তুমি গিয়ে আগে থিতু হও, তারপর এসে না হয় নিয়ে যেয়ো।’ বাবা বলেছিল, ‘আমি যাচ্ছি চোরাই পথে। যদি তাড়াতাড়ি কাগজ বানাতে না পারি, তাহলে আমার তো আর সহজে ফেরা হবে না। ওর মা ওকে ছেড়ে গিয়েছে, আমি ওকে ছেড়ে যেতে পারব না। একটু না হয় কষ্টই হবে, তবুও তো মেয়েটা শান্তি পাবে, আমিও স্বস্তিতে থাকব।’ কথাগুলো এখনো কানে ভাসে এমিলির। সেই বাবাকে, তার সেই স্নেহপ্রবণ বাবাকে গতকাল সে ফেলে এসেছে সাবওয়েতে! ভাবতে ভাবতে চোখ দুটো ভরে ওঠে জলে।
আর একটি মুহূর্তও বসে থাকতে পারে না এমিলি। দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে দু’ব্লক হেঁটে গিয়ে ‘আর’ ট্রেনে চেপে বসে। ট্রেন অন্যান্য দিনের মতো যথানিয়মে চললেও মনে হয় খুব ধীরে চলছে। তাপমাত্রা মাইনাস টু হলেও উত্তেজনায় ঘামতে থাকে সে।
ট্রেন হ্যারল্ড স্কয়ারে থামতেই এমিলি দৌড়ে নামে ট্রেন থেকে। ছুটে যায় যেখানে গত রাতে বাবাকে বসিয়ে রেখে এসেছিল, সেখানে। নেই... নেই... কোথাও নেই তার বাবা। এই ঠান্ডার মধ্যে কোথায় গেল। সে তো স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে, বাড়ির ঠিকানাও তো মনে করতে পারবে না, তাহলে কোথায় গেল বাবা।
সাবওয়েতে কত মানুষের ছড়াছড়ি। কেউ নামছে ট্রেন থেকে, কেউ চড়ছে, কেউবা অপেক্ষা করছে অন্য ট্রেনের জন্য। এত মানুষের মধ্যে কোথাও নেই তার বাবা। কাউকে জিজ্ঞাসা করতেও সাহস হয় না ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে।
নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরে আসে এমিলি। দরজা খুলে থপ করে বসে পড়ে বিছানার ওপর। এমন সময় সেল ফোনটা বেজে ওঠে। বালিশের পাশে রাখা সেল ফোনটার স্ক্রিনে রিকার্ডোর মুখটা দেখে আর ফোন রিসিভ করতে ইচ্ছে হয় না তার। অনবরত বেজে চলে ফোন। কাঁদতে থাকে এমিলি : ‘আমি কন্যা নামের কলঙ্ক...পৃথিবীতে আমার মতো খারাপ কন্যা আর দ্বিতীয়টি নেই...ক্ষমা করো প্রভু আমায়...না-না ক্ষমা কোরো না প্রভু, শাস্তি দাও আমাকে...আমার মতো একটি অকৃতজ্ঞ কন্যাকে উচিত শাস্তি দাও তুমি...!’
ফোনটা বেজে বেজে একসময় নিশ্চুপ হয়ে যায়, সেই সঙ্গে এমিলি হারিয়ে যায় অতীতে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দিনগুলির স্মৃতি-বাবা তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন কত জায়গায়। মেক্সিকো থেকে প্রথমে টেক্সাস আসে তারা, তারপর ঘুরতে ঘুরতে একসময় থিতু হয় নিউইয়র্কে। অনেক চেষ্টা করেও তার বাবা মিখাইল বৈধ হতে পারে না এদেশে। ফলে সারাক্ষণ ধরা পড়ে দেশে ফেরত যাওয়ার ভয় নিয়ে ম্যানহাটনের গিফট শপ অথবা বিভিন্ন গ্রোসারিতে অর্ধেক বেতনে অড জব করে কাটাতে হয়েছে তার ইকোনমিক্সে অনার্স বাবাকে। পৃথিবীর স্বর্গরাজ্যে এসেও কখনো সচ্ছলতার মুখ দেখেনি তারা। বসবাস করছে সেই থেকে বিভিন্ন বাড়ির বেসমেন্টে সাবলেটে। সারা দিন গাধার খাটুনি খেটে মাঝরাতে বাবা ফিরত মদে টাল হয়ে। ফলে এমিলিও বেড়ে উঠেছে অনেকটা অরক্ষণীয় অবস্থায়। গোটা দশেক বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ব্রেকআপ হওয়ার পর একজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার, যে ব্যক্তিটির বৈধ কাগজপত্র আছে। ফলে তাকে পাওয়ার আশায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে এমিলি। এ সময় বাবার মদ খাওয়ার মাত্রাটাও বেড়ে যায়। এ নিয়ে কত বকাঝকা করেছে বাবাকে। অনেক পরে বুঝেছে, প্রিয়তমা স্ত্রী, দেশ সব হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটানোর অসহায় ক্ষোভ ভুলতেই বাবা প্রতিদিন আকণ্ঠ মদ পান করে। তাতে লাভের লাভ তো কিছু হয়নি, উল্টো শরীরের বারোটা বেজেছে। তারপর একদিন আলুর বিশাল একটি বস্তা নিয়ে যখন বেসমেন্ট থেকে উপরে উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে কোমরটা ভেঙে ফেলল এবং তার কিছুদিন পর স্ট্রোক করে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলল, তখন সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ল এমিলির কাঁধে। পাঁচটি বছর অনেক কষ্টে টেনে নিয়েছে সংসারটাকে সে। একসময় হাঁপিয়ে ওঠে। বারবার বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে রিকার্ডোকে। রিকার্ডোও স্ত্রীর মৃত্যুর পর সাত ঘাটের পানি খেয়ে তখন থিতু হওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় মিখাইল, এমিলির অথর্ব বাবা।
এমিলির এসব ভাবনার মাঝে খুট করে খুলে যায় ঘরের দরজা। প্রবেশ করে রিকার্ডো। উৎকণ্ঠা আর উন্না নিয়ে বলে, ‘কখন থেকে ফোন করছি, ফোন ধরছ না কেন?’
দৃষ্টিতে একরাশ ঘৃণা ছড়িয়ে রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে থাকে এমিলি।
‘কী হয়েছে বলবে তো?’
‘তোমার কথামতো আমি আমার বাবাকে ত্যাগ করেছি, এখন বলো কখন আমায় বিয়ে করবে?’
‘বিয়ে তো করবই, আমি কি বলেছি করব না!’
‘না, এখনই আমাকে বিয়ে করতে হবে তোমাকে...’
‘এখন! বিয়ের জন্য প্রস্তুতি তো লাগে।’
‘আমি কোনো কিছু শুনতে চাই না।’
‘তুমি কি পাগল হয়েছ, আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছ কেন!’
‘হ্যাঁ, আমি পাগলই হয়েছি, তা না হলে তোমার কথায় আমি আমার শিশুর মতো অসহায় বাবাকে একা সাবওয়েতে ফেলে আসি?’
‘আমি কি বলেছি তাকে সাবওয়েতে ফেলে আসতে?’ ‘তাহলে কোথায় রাখব তাকে আমি, কে আছে আমাদের এখানে? তুমি বলেছ, সে আমাদের সঙ্গে থাকলে তুমি আমাকে বিয়ে করতে পারবে না।’ ‘আমাকে তুমি ভুল বুঝো না। দ্যাখো, তোমার মতো একটা কাগজপত্রহীন মেয়েকে আমি বিয়ে করতে রাজি হয়েছি, সে তো তোমাকে ভালোবাসি বলেই। বিয়ের পর তোমার জন্য আবেদন করব। একদিন তোমারও কাগজ হবে। কিন্তু তাই বলে তোমার সঙ্গে তোমার অচল বাবার বোঝাও তো কাঁধে নিতে পারি না আমি। সে আবদার করাও অন্যায় তোমার।’ ‘সে যদি তোমার নিজের বাবা হতো?’ ‘ওল্ডহোমে পাঠিয়ে দিতাম। এদেশে বৃদ্ধ বয়সে কে কাকে টানে বলো? আমি যখন বুড়ো হয়ে যাব, তখন আমিও কখনো আমার সন্তানদের কাছে প্রত্যাশা করব না যে তারা আমায় দেখবে।’ ‘আমাদের কাগজ নেই, আমাদের তো ওল্ডহোম নেই। অথচ সে আমার বাবা! কত কষ্ট করেছে সে আমার জন্য। আমি তাকে আজ পথে ফেলে এলাম! ওহ গড! সে তার ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথাও বলতে পারে না। এ আমি কী করলাম।’
‘আমি তোমাকে ভালোবাসি এমিলি...তোমার নীল চোখ, পিঠভর্তি সোনালি কোঁকড়া চুলের গুচ্ছ, তোমার মিষ্টি চেহারা আমাকে আকৃষ্ট করে ভীষণভাবে...’
‘তাই বুঝি গত সপ্তাহে এএমসিতে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলে রোজমেরিকে নিয়ে, এর আগের সপ্তাহে অফিসের কাজে বাইরে যাচ্ছ বলে ক্যাথরিনকে নিয়ে তিন দিন কাটিয়ে এলে বাফেলোতে!’
‘সব মিথ্যে...কে...কে বলেছে তোমাকে এসব কথা!’
‘যেই বলুক, ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলো তো এসব কথা মিথ্যে।’
‘তুমি নিজে তোমার বাবাকে ফেলে এসে এখন মিছেমিছি নানা রকম বদনাম দিচ্ছ আমায়। মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার।’ ‘রিকার্ডো, আমি এই অনিশ্চিত জীবন থেকে পরিত্রাণ চাই। প্লিজ বলো, কবে বিয়ে করবে আমায়?’ ‘তা বোধ হয় আর সম্ভব নয়। কারণ তোমাকে বিয়ে করলে সারাটা জীবন আমার কাটাতে হবে তোমার নানা অভিযোগের মধ্যে। আমি জেনেশুনে সেই অশান্তির মধ্যে যেতে চাই না।’ ‘রিকার্ডো।’ চিৎকার করে ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো এমিলি ছুটে যায় রিকার্ডোর দিকে। চকিতে পেছনে সরে গিয়ে আক্রমণ ঠেকায় রিকার্ডো। বলে, ‘ভুলে যেয়ো না এখনো এদেশে অবৈধ তুমি, আর পুলিশ কল করলে...’
কথাটা আর শেষ করে না রিকার্ডো। শেষ করার প্রয়োজনও হয় না। দু’হাতে মুখ ঢেকে অসহায়ের মতো হাঁটু ভেঙে মেঝেতে বসে পড়ে এমিলি।