রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত হওয়ায় বিএনপির মহাসচিব পদে পরিবর্তনের বিষয়টিও বর্তমানে সামনে এসেছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে প্রথম ধাপে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মহাসচিব পদে কে আসবেন, সেই সিদ্ধান্ত দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর নির্ভর করছে।
গত ১ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যানের ওপর ন্যস্ত করা হয়। মির্জা ফখরুল নিজেও বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছিলেন, দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তারেক রহমান। ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। দলীয় সূত্রের দাবি, ওই দিন মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় মির্জা ফখরুলকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা করা হতে পারে। তিনি নিজে অবশ্য এখনো বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। রাষ্ট্রপতি হলে তাকে মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়তে হবে।
মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি প্রার্থিতা সামনে আসার পরই তার উত্তরসূরি হিসেবে রুহুল কবীর রিজভীর নাম আলোচনায় জোরালো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর, সাংগঠনিক কার্যক্রম, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও গণমাধ্যমে দলের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। ফলে দলে তার সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা মহাসচিব পদে বিবেচনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিএনপির নেতারা।
রিজভী ২০১৬ সালের বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। এর আগে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ১৯৮৯ সালে রাজশাক বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করলেও দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন।
বিএনপির দুঃসময়ে রিজভীর ভূমিকা দলের ভেতরে বিশেষভাবে আলোচিত। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের বাইরে অবস্থানকালে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দলীয় কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকার কারণে তৃণমূলেও তার একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে।
তবে মহাসচিব পদে রিজভী একমাত্র আলোচিত নাম নন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের নামও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নাম নিয়েও দলের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তবে মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি হিসেবে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে রিজভীর নামই বর্তমানে এগিয়ে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
রিজভী নিজে অবশ্য মহাসচিব পদ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানাননি। তার বক্তব্য, দলের চেয়ারম্যান বিষয়টি চূড়ান্ত করবেন এবং দলের সিদ্ধান্তই তিনি মেনে নেবেন। এদিকে সালাহউদ্দিন আহমদ ও জাহিদ হোসেনের নামও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে তাদের বর্তমান সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি দলের মহাসচিবের সাংগঠনিক দায়িত্ব সামলানো কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও দলের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব পদে সাময়িক পরিবর্তনের পাশাপাশি দলের দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব নিয়েও সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হবে। কারণ ২০১৬ সালের পর প্রায় এক দশক ধরে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হয়নি। দলীয় সূত্র বলছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। কাউন্সিল হলে নতুন মহাসচিব নির্বাচনের বিষয়টিও আনুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তি হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে মহাসচিব পদে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করা। সেই বিবেচনায় দীর্ঘদিনের মাঠের রাজনীতি, কেন্দ্রীয় দপ্তর পরিচালনা এবং তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতা রিজভীকে এগিয়ে রাখছে। তবে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া আর পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হওয়া এক বিষয় নয়। শেষ পর্যন্ত জাতীয় কাউন্সিল ও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন।