ড. ইউনূসের সম্মানে দাঁড়িয়ে করতালি ৪০০ দর্শকের, হিলারি ক্লিনটনের হাত থেকে গ্রহণ করলেন পুরস্কার
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩১
•
অনলাইন সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে এক মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে সম্মান জানিয়েছেন প্রায় ৪০০ দর্শক। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক গ্যাস্টন হলে তাঁর নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত দর্শকেরা উঠে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ করতালি দেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটনের হাত থেকে তিনি গ্রহণ করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ড. ইউনূসকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রায় ২৫টি দেশের রাষ্ট্রদূত, উদ্যোক্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় ৪০০ অতিথি উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসের পাশাপাশি ভারতের সেলফ-এমপ্লয়েড উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনের (SEWA) পরিচালক রিমা নানাবতী এবং মার্কিন ফ্যাশন ডিজাইনার ও টোরি বার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা টোরি বার্চকে একই পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। জর্ডানের মাইক্রোফান্ড ফর উইমেনের বোর্ড চেয়ার মুনা সুখতিয়ানকে দেওয়া হয় বিশেষ ‘জর্জটাউন অ্যাম্বাসেডরস অ্যাওয়ার্ড’।
ড. ইউনূসের দীর্ঘ কর্মজীবন ও গ্রামীণ ব্যাংকের অবদানের প্রশংসা করে হিলারি ক্লিনটন বলেন, তিনি নিজে বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেছেন। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নারীরা কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং নিজেদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেছেন, তা অসাধারণ। ড. ইউনূসের উদ্যোগ শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বিস্তৃত হয়েছে।
সম্মাননা গ্রহণের পর ড. ইউনূস বলেন, গ্রামীণ উদ্যোগের ৫০ বছরের অর্জনের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার বার্তা পৌঁছে দেবে।
তিনি বলেন, ‘এখানে আবার আসতে পেরে আমি আনন্দিত। আমাদের কাজের পঞ্চাশ বছরের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। এ বছরই আমাদের পঞ্চাশ বছর পূর্তি।’
ড. ইউনূস স্মরণ করেন, পাঁচ দশক আগে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই এবং দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল নারীদের ওপর। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে লাখ লাখ নারী নিজেদের জীবন ও পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন।
তিনি বলেন, একসময় যে নারীরা সংকোচ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাতেন, তাঁরা এখন আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী। নিজেদের অধিকার ও প্রয়োজনের কথা বলছেন। গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় তাঁদের অংশগ্রহণ সেই পরিবর্তনকে আরও শক্তিশালী করেছে।
বক্তৃতায় তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, ‘আমরা চাকরিপ্রার্থী নই, আমরা চাকরিদাতা।’ তরুণদের শুধু চাকরি খোঁজার পরিবর্তে নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সামাজিক ব্যবসার ধারণা ব্যাখ্যা করে ড. ইউনূস বলেন, ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য শুধু ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন নয়; সমাজের সমস্যার সমাধান করাও হতে পারে। বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, চক্ষু হাসপাতাল ও চিকিৎসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি জানান, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। বছরের শেষ নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম শুরু করার আশা প্রকাশ করেন তিনি। প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলাই হবে এর অন্যতম লক্ষ্য।
ড. ইউনূস বলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল চাকরিপ্রার্থী তৈরি করা নয়; বরং সৃজনশীল, আত্মনির্ভরশীল ও উদ্যোগী মানুষ গড়ে তোলা।
অনুষ্ঠানে গ্রামীণ ব্যাংকের অর্ধশতাব্দীর অর্জন, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করার প্রচেষ্টা বিশেষ গুরুত্ব পায়।