সংসদ তোষামোদের জায়গা নয়, ট্যাক্সের টাকায় যেন চরিত্র হনন না হয়: শফিকুর রহমান
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬, ১৪:২৮
•
অনলাইন সংস্করণ
জাতীয় সংসদে ব্যক্তি তোষামোদে গান-কবিতা ও স্বপ্নবিলাসের অতীত ‘ব্যাড কালচার’ পুরোপুরি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, সংসদ কোনো তোষামোদের জায়গা নয়; এটি দায়িত্ব পালনের পবিত্র স্থান। জনগণের করের টাকা খরচ করে এখানে যেন আর কারও চরিত্র হনন না করা হয়।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলের চিন্তাভাবনা এক হওয়া স্বাভাবিক নয়। ভিন্নমতই সংসদের প্রাণ, আর সেই বৈচিত্র্যই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজ নিজ বিবেক, মহান আল্লাহ ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাজেট অধিবেশনকে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, পুরো বছরের কর্মকাণ্ড অনেকাংশে এই বাজেটের ভিত্তির ওপর নির্ভর করে। তাই সংসদ সদস্যরা দায়িত্ববোধ থেকেই আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।
বক্তব্যে তিনি মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী এবং আ স ম আবদুর রবের অবদানের কথা স্মরণ করেন। পাশাপাশি ৯০-এর গণআন্দোলন, ২৮ অক্টোবর, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর এবং দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের শহীদ ও সংগ্রামীদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান।
নিজ দলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একে একে ১১ জন সিনিয়র নেতাকে হারিয়ে এখন তিনি ১২তম ব্যক্তি হিসেবে জীবিত রয়েছেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের প্রতিও তিনি সমবেদনা জানান।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডকে জাতির শক্তির জায়গায় আঘাত হিসেবে বর্ণনা করে শহীদ সেনাসদস্যদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন তিনি। সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে গঠিত বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের পার্লামেন্ট’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদের কোনো আচরণ যেন দেশবাসীকে আঘাত না করে; বরং ঐক্য ও আশার বার্তা দেয়।
বাজেটের সংখ্যাগত বিশ্লেষণের চেয়ে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, সংসদ দুটি চাকার ওপর চলে—সরকারি দল ও বিরোধী দল। একটি চাকা অচল হলে পুরো ব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, সরকার ভালো উদ্যোগ নিলে বিরোধী দল তা সমর্থন করবে, আবার ভুল বা জনস্বার্থবিরোধী কোনো পদক্ষেপের সমালোচনাও করবে। বিরোধী দলের কাজ হলো ‘ওয়াচ ডগ’ বা প্রহরীর ভূমিকা পালন করা, যাতে জনগণের অর্থের অপচয় বা অধিকারবঞ্চনার ঘটনা না ঘটে।
অতীতে সংসদে ব্যক্তি তোষামোদে গান, কবিতা ও স্বপ্নবিলাসের চর্চার কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের ট্যাক্সের অর্থ ব্যয় করে সংসদকে কারও প্রশংসা কিংবা অন্যের চরিত্রহননের মঞ্চে পরিণত করা যাবে না। স্পিকারের প্রতি তিনি এ ধরনের অপসংস্কৃতি সম্পূর্ণ বন্ধ করার আহ্বান জানান।
প্রস্তাবিত বাজেটের জন্য অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট প্রণয়ন করা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। তবে কোনো বাজেটই ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়, তাই গঠনমূলক সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সম্পূরক বাজেটের কাটমোশন সহজে বাতিল করে দেওয়ার পুরোনো সংস্কৃতির সমালোচনা করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার বিরোধী ও সরকারি দলের যৌক্তিক প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে, যাতে জনগণ বুঝতে পারে সংসদীয় আলোচনা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়।
বাজেট বাস্তবায়নে কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, জুলাই-জুন অর্থবছরের কারণে বছরের শেষভাগে তাড়াহুড়ো করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতি এড়াতে তিনি অর্থবছরকে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, বাজেট সংসদে পাস হলেও বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ ও কর্মকর্তাদের ওপর। তাই জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে তাদের জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য।